Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

শিল্পী সুলতানের সঙ্গে কিছুক্ষণ

Icon

আবু সাঈদ খান

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫, ১৮:৩৮

শিল্পী সুলতানের সঙ্গে কিছুক্ষণ

শামসুর রাহমান [জন্ম : ২৩ অক্টোবর ১৯২৯; মৃত্যু : ১৭ আগস্ট ২০০৬]

মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-উদয়শংকর-রবিশংকরের নাম জড়ানো বৃহত্তর যশোরের আজকের নতুন জেলা নড়াইলের পৌরসীমানার শেষ প্রান্তের এক গ্রাম-লাবণ্যের ছায়াঘন পাখ-পাখালির নিবিড় বসতির ভেতরে কৃষকজনের একজন হয়ে বাস করছেন শিল্পী এসএম সুলতান। বাড়ি ঘেঁষে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী চিত্রা। গ্রামটির নাম মাছিমদিয়া। অদূরেই আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ।

গত ৪ আগস্ট শিল্পীর মুখোমুখি হই। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় আইনজীবী-রাজনীতিক হেমায়েত উল্লাহ হিরু। গাছপালাঘেরা বাড়ির আঙিনায় মোড়া পেতে বসেছিলেন শিল্পী। আঙিনার বাঁশের গেট দিয়ে ঢুকতেই আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। মাথার লম্বা চুলের বেণী পেছনে দোলানো। শ্মশ্রুমণ্ডিত, পরিচ্ছন্ন অথচ পরিশ্রান্ত একসময়ের বলিষ্ঠ দেহকাঠামো নিয়ে শিল্পী গেটের দিকে এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে হাত মেলালেন।

আমাদেরকে বসালেন তার ছবি আঁকার ঘরে। তার সদ্য আঁকা ছবিগুলো দেখলাম। একটি ছবির বিষয় : কৃষক ধান কাটছে এবং ধানের আঁটি মাথায় ঘরে ফিরছে। আরেকটি : চর দখলের লড়াই। চর দখলের লড়াই নিয়ে তিনি আগেও ছবি এঁকেছেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন- ওটা নষ্ট হয়ে গেছে। এটা নতুন করে আঁকছি। আমরা বললাম- আগেরটার মতো ফিগার এটাতে নেই। তিনি বললেন- আগের মতো আর পারি না, বয়স বেড়ে গেছে, শরীরও খারাপ। পেছনের আরেকটা ক্যানভাসে : জেলে নৌকা- মাছ ধরার দৃশ্য।

চিত্রের মানুষগুলো পেশিবহুল স্বাস্থ্যবান। এত পেশিময়তার কথাটি উচ্চারিত হতে না হতেই তিনি কথাটি কেড়ে নিয়ে বললেন- সবাই আমাকে এই প্রশ্নই করে যে, আমার ছবির মানুষগুলো এত স্বাস্থ্যবান কেন, বাস্তবে তো তা নয়। আমি বলি যে, কৃষকদেরকে আমি এমন স্বাস্থ্যবান দেখতে চাই। আমাদের পূর্বপুরুষরা স্বাস্থ্যবানই ছিলেন, তারা ছিলেন দ্রাবিড়, অস্ট্রিক বীরপুরুষ। আজ শোষণে শোষণে হাড্ডিসার হয়ে গেছে। দুইশ বছর ইংরেজ শোষণ করেছে, পাকিস্তানিরা করেছে। এখনও এক শ্রেণি চুষছে। এই ভাবে শোষিত না হলে এমন স্বাস্থ্যবানই থাকত। ওরা কাজ করে, মেহনত করে, এই অ্যাকশনে পেশি বিভিন্ন ফরম গ্রহণ করে, তাই অ্যাকশন বোঝাতে হলে পেশি আসবেই।

কথা প্রসঙ্গে বললাম- অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকেন কিনা। বললেন- আমি সাধারণ মানুষের জন্য ছবি আঁকি। তারা যা বুঝবে না তা আঁকি না। নিজের থেকেই বললেন- অনেকে আমার এই ধারার সমালোচনা করেন, তা করুন। আমি মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে থাকতে চাই, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাই। বললাম- বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তো মানুষকে উন্নততর জীবন দিয়েছে, তা চিত্রে আনবেন কিনা। তিনি বললেন- তা ঠিক, তবে বেশিরভাগ মানুষই তো বঞ্চিত থাকছে।

বর্তমান শিল্পীদের নিয়ে তার আশাবাদ থাকলেও তিনি মনে করেন তারা জীবন থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন।

আগে তিনি রঙ নিজে তৈরি করতেন। এখন এত মেহনত করতে পারেন না বলে তৈরি রঙ ব্যবহার করছেন। তবে তিনি দেশীয় চটের ক্যানভাসে গাবের গোলা লাগিয়েছেন। আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন- এতে শক্তও হয়, টেকেও বেশিদিন। প্রশ্নোত্তরে বললেন- সরকার বছরে ছয়টি ছবির বিনিময়ে ৮৪ হাজার টাকা দেয়। আমার ছয়/সাতজনের পরিবার এবং খুদে চিড়িয়াখানার পাখিদের তাতে কী হয়। প্রতি বেলায় ৮ সের চাল লাগে। মাসে ১৫ হাজার টাকা দরকার। এই অকৃতদার শিল্পীর পরিবার অনেক বড়। কয়েকজন মজুর, বাবুর্চি ছাড়াও পোষা কুকুর, বিড়াল, বেজি, ইঁদুর, বিভিন্ন রকমের পাখিরাও তার পরিবারের সদস্য। আমরা যখন কথা বলছিলাম, পায়ের কাছে কুকুর নির্ভয়ে লেজ নাড়ছিল। বিড়াল এসে কোলে বসেছিল। তিনি এটিকে মানবশিশুর মতোই আদর করছিলেন। বললেন- ওর নাম কল্পনা। আরেকটি বাড়ির কর্তা বিড়াল- বাঘের মতো দাপট বলে বাঘ নামে ডাকেন। আর যেটি গলা ফোলা তার নাম হুমায়ুন। শিল্পী বললেন- একেবারে বাদশাহ্ হুমায়ুনের মতোই দেমাগ। শিল্পী বললেন- শিগগিরই ঢাকায় একটি প্রদর্শনী করবেন। আরেকটি জার্মানিতে। এ জন্য দুর্বল শরীর নিয়েও ছবি আঁকছেন। কিছুদিন আগে যশোর সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেননি। তবে তিনি ধূমপান ও অন্য নেশা ছেড়ে দিয়েছেন, নিজে থেকেই বললেন। আরও বললেন- সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। শীতের মধ্যে গেলে কি বাঁচব? আর আমার পশুপক্ষীদের কে দেখবে। সকাল থেকে হাসনাত আবদুল হাই ছিলেন। আমাকে নিয়ে একটি বই বের করবেন। তার জন্য কিছু আঁকাআঁকি করতে হয়েছে।

বললাম- বিচিত্রায় যখন বেরিয়েছিল পড়েছি। এর আগেও আহমদ ছফাও লিখেছিলেন। তিনি বললেন- ছফা ভাইয়ের লেখাটি আমার পছন্দ হয়েছিল। আক্ষেপ করে বললেন- অনেকদিন তার সঙ্গে দেখা হয় না, তিনি কেমন আছেন, তিনিও তো অসুস্থ ছিলেন, আপনাদের সঙ্গে কি দেখা হয়? ঢাকায় গেলে কি দেখা হবে? হলে বলবেন- একবার যেন বেড়িয়ে যান।

এরপর শিল্পীর চিড়িয়াখানায় ঢুকলাম- বেজি, বানর, বিভিন্ন জাতের ইঁদুর, রকমারি পাখি খাঁচায় খাঁচায় সারি সারি সাজানো। শিল্পী সবাইকে আদর করছিলেন, কথা বলছিলেন আর আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। বিরাট একটি মদনটেক- রোজ টাটকা মাছ-মাংস খাওয়াতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে বাগানে এ গাছ সে গাছ দেখছিলাম। শিল্পী গাছপালার বিভিন্ন প্রজাতির সম্পর্কে কথা বলছিলেন। এগুলো তিনি অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করেছেন। প্রশ্ন করলাম- আপনার জীবনদর্শন কী? মৃদু হেসে বললেন- মরলে বেহেশতেও যাব না, দোজখেও যাব না। প্রকৃতির সঙ্গেই মিলেমিশে থাকব।... তবে পুনর্জন্ম মানি না। আমার মতো অন্যদেরও সুখ-দুঃখ আছে, অনুভূতি আছে। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকাই আমার পছন্দ। তাই মানুষ, পশু, পাখি, বৃক্ষরাজি- সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাস করছি।

প্রসঙ্গক্রমে বললেন- দেশের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নদী দিয়ে মাঝি নৌকা বেয়ে যায়; কিন্তু গলা থেকে গান বেরোয় না। কেবল টিভির মাঝিই গান গায়।

টিভি দেখেন? মাঝে মাঝে দেখি। সব প্রোগ্রাম ভালো লাগে না। একটু আগে চৌধুরী বাড়ি ছবি দেখছিলাম। ভালো লাগল না। তাই উঠে এসেছি। অন্যেরা দেখছে। তবে কিছু কিছু নাটক ভালো লাগে।

উচ্চাঙ্গ সংগীত তার পছন্দ। অনেক ক্যাসেট সংগ্রহে রয়েছে। তিনি প্রায়ই শোনেন। দেশের পরিস্থিতি তুলতে বললেন- কেউ সাহস করে কথা বলতে পারছে না, তা বলতে হবে।

শিল্পীকে ‘গণসংস্কৃতি’র দুটি সংখ্যা দিতেই বললেন- বাহ, সুন্দর নাম তো। তিনি পড়ার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

শিল্পী আমাদের তাড়াহুড়ার মধ্যে শেষ মুহূর্তে চায়ের কথা বলতে ভোলেননি। তিনি আত্মভোলা মানুষ নন। সমাজসচেতন মানুষ। গণমানুষের শিল্পী মানুষ। আমাদের কালের এক সেরা শিল্পী।

একজন চিত্রসমালোচক বলেছেন- যেখানেই সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছে, মিশরে, চীনে, বাংলায়, ব্যাবিলনে; সবখানে বন কেটে বসত গড়ার দিনে- বনের অগ্নিকুণ্ড ছেড়ে ঘরের দাওয়ায় সান্ধ্য প্রদীপ জ্বালানোর নম্রমধুর ক্ষণে তারা হাজির ছিল... সুলতানের আঁকা এই মানুষেরা তাই বাংলাদেশের হয়েও সমস্ত পৃথিবীর মানুষ। 

[লেখাটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো। ১৩৯৭ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে ‘গণসংস্কৃতি’ পত্রিকায় লেখাটি প্রথম প্রকাশ হয়েছিল।]

Logo